কুখ্যাত নাপাক ইয়াজিদ কাফির কীনা, তাকে লানত করা যাবে কীনা?
কুখ্যাত নাপাক ইয়াজিদ কাফির কীনা, তাকে লানত করা যাবে কীনা?
কুখ্যাত নাপাক ইয়াজিদ কাফির কীনা, তাকে লানত করা যাবে কীনা এটা নিয়ে আসলেই ইমামগণ ৩ ভাগে বিভক্ত সেই শুরু থেকেই।
কোন ইমাম বলেছেন কাফির নয় সে বরং ফাসিক, তাই লানত করা ঠিক হবে না।
কেউ বলেছেন লানত দেয়া যাবে তবে কাফির নয় বরং ফাসিক।
কোন কোন ইমাম বলেছেন সে কাফির ছিল এবং তাকে লানত দেয়া যাবে। এগুলো ইমামগণের নিজস্ব উসুল বা মূলনীতি অনুসারে দেয়া ফায়সালা যা আমরা সম্মান করব।
কিন্তু আমি ইয়াজিদকে কাফির বলা ও লা'নত দেয়ার পক্ষের ইমামগণের মতকেই অনুসরণ করি।
মূলতঃ ইয়াজিদ থ্রি ইন ওয়ান বা একের ভেতরে ৩ ছিল। সে ফাসিক, মুনাফিক ও কাফির ছিল।
ইয়াজিদ (লা'নাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম হোসাইন রা. এঁর সরাসরি শহীদকারী উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ, শিমার ও ওমর ইবনে সাদকে (লানাতুল্লাহি আলাইহিম) প্রমোশন দিয়েছিল ইমাম হোসাইন রা.আ. কে শহীদ করে আসার পর। যদি সত্যিই সে এই নৃশংসতম কাজের হুকুম না দিত কিংবা এই ভয়ানক বিষয়কে খারাপ মনে করত তবে তাদেরকে প্রমোশন না দিয়ে অবশ্যই শাস্তি দিত। শাস্তি না দিক অন্তত সেনাবাহিনী থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করত৷ না, এরকম কিছুই করে নাই সে বরং খুনীগুলোকে প্রমোশন দিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তারা বহাল তবিয়তেই ছিল ইয়াজিদ বাহিনীতে। কাজেই পাপিষ্ঠ ইয়াজিদই ইমাম হোসাইন রা. আ. কে শহীদ করতে আদেশ দিয়েছিল এবং এই কাজে সে সন্তুষ্ট ছিল, তার পথের কাঁটা সড়েছেন বলে, যা বুঝার জন্য রকেট সাইন্স বুঝতে হয় না। পানির মত সরল বিষয়। পরবর্তীতে আরেক বিতর্কিত চরিত্র (?) মুখতার সাকাফি এসে এই জালিম লানতিগুলোকে একে একে জাহান্নামে পাঠান৷ এরা তখনো ওমাইয়া ইয়াজিদ বাহিনীর একেকজন জেনারেল হিসেবে বহাল তবিয়তে ছিল। কাজেই ইয়াজিদকে ইমাম হোসাইন রা. আ. এঁর শাহাদাতের ঘটনা থেকে যে ইমামগণ দায়মুক্তি দিতে চেয়েছেন নিশ্চিত তাঁদের ইজতিহাদি ভুল হয়েছে, বিচার বিশ্লেষণগত ভুল হয়েছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।
আর প্রিয়নবী ﷺর পরিবার তথা আহলে বায়তকে কষ্ট দেয়া আল্লাহ ও রাসুল ﷺ কে কষ্ট দেয়া একই কথা।
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি। (সূরা আহজাব ৩৩ঃ আয়াত নং ৫৭)
কারবালার জমিনে ইমাম হোসাইন রা. আ. কে শহীদ করার সাথে এজিদসহ যারা যারা জড়িত ছিল সবাই আল্লাহ পাক ও তাঁর হাবিব ﷺকে কষ্ট দিয়েছে। কাজেই তারা মুসলিম হতে পারে না। তাদের উপর লানত। উল্লেখ্য আকিদার একটি বিষয় এখানে বলে নিই, আল্লাহ পাককে কষ্ট দেয়ার ক্ষমতা কোন সৃষ্টির নেই, এর অর্থ হবে আল্লাহ পাককে রাগান্বিত করে দেয়া কিংবা আল্লাহ পাকের ক্রোধকে বাড়িয়ে দেয়া।
আর ইমাম হোসাইন আ. রা. এঁর শাহাদাতের পর মদিনার আনসার সাহাবাগণ (যাদের ভালোবাসাকে ইমান বলা হয়েছে মুসলিম শরিফের ইমান অধ্যায়ের সহিহ হাদিসে) কিংবা তাঁদের আওলাদেরা যখন পাপিষ্ঠ ইয়াজিদকে খলিফা বলে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলেন, তখন ইয়াজিদ লা. আ. একদল সৈন্য প্রেরণ করল পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারাবাসীকে শায়েস্তা করার জন্য, ওয়াল ই'য়াজুবিল্লাহ। তিন দিনের জন্য সে মদিনা শরীফে রক্তপাত, ধর্ষণ ও লুটতরাজ বৈধ বলে ঘোষণা করে দিল। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। হাররার ময়দানের সেই হৃদয়বিদারক যুদ্ধে অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের আওলাদগণকে ইয়াজিদ বাহিনী শহীদ করে। তাঁদের স্ত্রী- কন্যাদেরকে তারা ধর্ষণ করে এবং এর ফলে অনেকের গর্ভে অবৈধ সন্তান চলে আসে। কী বলব! কলমে লেখা আসে না এই পাপিষ্ঠ কমবখত ইয়াজিদের আমলনামা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে, আংগুল চলতে চায় না। এই জালিম সম্পর্কে কী লিখব! মসজিদে নববী শরীফকে ঘোড়ার আস্তাবল বানায় তারা। তিনদিন পর্যন্ত মসজিদে নববীতে আজান, ইকামাত ও নামাজ কিছুই হয়নি।
প্রিয় পাঠক! এই ঘটনাগুলো কোন সনদ ও রেফারেন্স এর মূখাপেক্ষী নয়। ইসলামের ইতিহাসের যেই নির্ভরযোগ্য কিতাব খোলবেন সেই কিতাবেই এগুলো পাবেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখেও এই ঘটনাগুলো মুতাওয়াতির বা অসংখ্য বর্ণনায় অকাট্য পর্যায়ের বর্ণনা৷
অতঃপর ইয়াজিদ মক্কা- মদিনা তথা হেজাজ প্রদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী শাসক, মদিনা শরিফে জন্ম নেয়া প্রথম মুহাজির মুসলিম সন্তান, বিশিষ্ট সাহাবি, প্রিয়নবী ﷺর আপন ফুফাত ভাইয়ের দিকের ভাতিজা, হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এঁর নাতি, জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত সাহাবি হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. ও হজরত আসমা বিনতে আবি বকর রা. এঁর বড়পুত্র, আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রা. এঁর বোনের ছেলে, প্রিয়নবীর ﷺ শিংগার রক্ত পানকারী মহাসৌভাগ্যবান হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. কে শহীদ করার জন্য, তাঁকে মক্কা শরিফ থেকে উৎখাত করার জন্য নিকৃষ্ট মুসলিম ইবনে উকবাকে প্রেরণ করে মক্কা শরিফ অভিমূখে। এই নাপাক মুসলিম ইবনে উকবা হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. কে উৎখাত করার জন্য মক্কা শরিফের পাহাড়ের উপর থেকে কাবা শরিফ অভিমুখে মিনজানিক বা আগুনের গোলা ছুড়ে। এতে কাবা শরিফের গেলাফ মুবারক জ্বলে যায়। হাজরে আসওয়াদ ভেংগে টুকরো টুকরো হয়ে যায়৷ দেয়াল ধ্বসে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীনই মুসলিম ইবনে উকবা খবর পায় তার কমবখত মুনিব ইয়াজিদ (মদ পান করে মাতাল হয়ে নাচতে নাচতে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে মারা যায় বলে ইমাম জাহাবির রাহ. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা কিতাবে উল্লেখ আছে এই অভিশপ্ত ইয়াজিদের জীবনিতে) জাহান্নামে চলে গেছে। তখন সে মক্কা আক্রমণে বিরতি দিয়ে দামেশক অভিমূখে চলে যায় সৈন্য বাহিনী নিয়ে। পরবর্তীতে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. নতুন করে কা'বা শরিফকে হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺর ওসিয়ত ও ইচ্ছানুসারে হজরত ইব্রাহিম আ. এঁর সময়কার কা'বা শরিফের ভিত্তির উপরে পুনঃনির্মাণ করেন হাতিমে কা'বাকে কা'বার ভেতরে নিয়ে৷ হাজরে আসওয়াদকে জুড়া দিয়ে আবারো কা'বা শরিফের দেয়ালে প্রতিস্থাপন করা হয়৷ পরবর্তীতে ১০ বছর পর কুখ্যাত ওমাইয়া গুন্ডা জালিম হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ অবৈধ ওমাইয়া বাদশাহ আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের আদেশে আবারো মক্কা শরিফে আক্রমণ করে, মিনজানিক বা আগুনের গোলা ছুড়ে কা'বা শরিফ অভিমুখে। কাবা শরিফ জ্বালিয়ে দেয়, দেয়াল ভেংগে পড়ে৷ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. কে নির্মমভাবে শহীদ করে এবং দেহ মুবারাক শূলে চড়িয়ে কা'বা শরিফের সামনে ঝুলিয়ে রাখে। এই কসাই হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের আদেশে আবার কাবা শরিফকে জাহেলি যুগের ভিত্তির উপরে পুনঃনির্মাণ করে। পরবর্তীতে অবৈধ ওমাইয়া বাদশাহ আব্দুল মালিক হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺর ইচ্ছার কথা নির্ভরযোগ্যসূত্রে জানতে পেরে কা'বা শরিফ নতুন করে ইব্রাহিমি ভিত্তির উপরে (হাতিমে কা'বাকে ভেতরে নিয়ে আয়তক্ষেত্রাকার করে) নির্মাণ করতে চায়, কিন্তু কিছু উলামায়ে কেরাম এতে বাধা দেন, তাঁরা বলেন কা'বা শরিফকে আপনারা শাসকেরা কী খেলার সামগ্রী বানাতে চাচ্ছেন? বারবার ভাংগা গড়া করবেন? সেই সময় থেকে কা'বা শরিফ বর্তমান স্কয়ার বা বর্গাকৃতিতেই আছে। এর মাঝেও অবশ্য বেশ কয়েকবার পূনঃনির্মান হয়েছে। কাজেই এখন যে ব্যক্তি হাতিমে কা'বাতে নামাজ পড়বে সে মূলতঃ কা'বার ভেতরের অংশেই নামাজ পড়ছে। এজন্যই এখানে নামাজ আদায় করতে মানুষ অস্থির থাকে। এটা হয়ত কা'বা শরিফের ভেতরে সাধারণ মানুষের জন্য নামাজ পড়ার এক সুযোগ আল্লাহ পাকই করে দিয়েছেন।
যাইহোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি, মক্কা শরিফ ও মদিনা শরীফে রক্তপাত তো দূরের কথা, বিনা প্রয়োজনে গাছের পাতা ছেড়া হারাম। পবিত্র নগরীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে এই দুই নগরীকে। একত্রে এজন্য হারামাইন শরিফাইন বলা হয় এই দুই পবিত্র নগরীকে। সেই দুই শহরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল ইয়াজিদ প্রেরিত বাহিনী৷ হারাম নগরীকে যে হালাল করে সে মুসলমান থাকে কী করে? নফসের ধোকায় শয়তানের প্রতারণায় হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া কবিরা গোনাহ৷ কিন্তু হারাম কাজকে হালাল সাব্যস্ত করলে ইমান থাকে না, এটা প্রায় সমস্ত ফুকাহা ইমামগণের মত।
তাহলে মক্কা ও মদিনা শরিফ এবং এখানকার বাসিন্দাদের সম্মান নষ্টকারী ও সম্মান নষ্ট করা হালাল করে দেয়া ইয়াজিদ কিভাবে মুসলমান থাকে?

